আনসার বাহিনী প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে: প্রধানমন্ত্রী
নগরি২৪
নিউজ প্রকাশের তারিখ : May 20, 2026 ইং
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বাংলাদেশ আনসার বাহিনী তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থান তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। বুধবার (২০ মে) সকাল ১০টায় গাজীপুরের সফিপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ আনসার ভিডিপি একাডেমির মিলনায়তনে বাহিনীর ৪৬তম জাতীয় সমাবেশ-২০২৬ ও ব্যুত্থান মহড়া প্রদর্শনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তায় আনসার সদস্যরা নিরলসভাবে কাজ করছেন। গ্রাম থেকে শহর এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম অঞ্চল পর্যন্ত এই বাহিনী তাদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। দেশের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সময় শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে আনসার সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। দুর্যোগকালে জনগণের সেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই বাহিনী একটি স্বতন্ত্র ও শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনীর মর্যাদা অর্জন করেছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমানে বাহিনীর ১৩ হাজারের বেশি সদস্য ফ্রিল্যান্সিং ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করছেন, যা সামাজিক আস্থা ও সম্প্রতি জোরদারে ভূমিকা রাখছে। নগর এলাকায় টিডিভি সদস্যরা নিরাপত্তার পাশাপাশি সমাজের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করছেন। এছাড়া 'সঞ্জিবন' প্রকল্পের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আনসার ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে বিদেশে দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর উদ্যোগ বাহিনীর ভিশন ও কর্মপরিকল্পনাকে আরও শক্তিশালী করবে।
প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, নিষ্ঠা, শৃঙ্খলা, পেশাদারিত্ব ও দেশপ্রেমের মাধ্যমে আনসার-ভিডিপি ভবিষ্যতে একটি প্রযুক্তিনির্ভর মানবিক ও সামাজিক বাহিনী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'যে কোনো দেশেই যে কোনো সুশৃঙ্খল বাহিনীর জন্য ‘চেইন অব কমান্ড’ ও ‘ডিসিপ্লিন’ মেনে চলা অনিবার্য ও অবশ্য পালনীয় নীতি। এই দুইটি বিষয়ে সামান্যতম অবহেলা থাকলে কোনো বাহিনী প্রকৃত অর্থে সুশৃঙ্খল বাহিনী হয়ে উঠতে পারে না। আপনাদের এ বিষয়টি গভীরভাবে মনে রাখতে হবে। কোনো বাহিনীর মধ্যে শৃঙ্খলার অভাব দেখা দিলে সেই বাহিনী সম্পর্কে জনমনে আস্থার সংকট সৃষ্টি হয়।'
তিনি বলেন, 'পেশাদারিত্ব, জনসম্পৃক্ততা এবং তৃণমূল পর্যায়ে নিরাপত্তা ও সামাজিক উন্নয়নে অবদানের মাধ্যমে আনসার ও ভিডিপি একটি বহুমাত্রিক ও জনমুখী বাহিনীতে পরিণত হয়েছে।'
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে বাহিনীর ভূমিকার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'ওই সময় আনসার ও ভিডিপি সদস্যরা থানা পাহারা, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা নিশ্চিতে ভূমিকা রেখেছে। এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি বাহিনীটি সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবা প্রদানের ক্ষেত্রেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।'
তিনি বলেন, 'ব্যাটালিয়ন আনসার, অঙ্গীভূত আনসার, থানা বা উপজেলা আনসার এবং ভিডিপি-টিডিপি,এই প্রতিটি শক্তি সমন্বিতভাবে দেশের নিরাপত্তা ও তৃণমূলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলছে। আমি মনে করি, এই কাঠামোই বাহিনীটিকে কেন্দ্রীয় ও তৃণমূলভিত্তিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে।'
পার্বত্য চট্টগ্রাম, সরকারি দপ্তর, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, শিল্প কলকারখানা, বিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় নিরাপত্তা প্রদান, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নারী নির্যাতন মোকাবিলা ও মাদক বিরোধী কার্যক্রমসহ নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে আস্থা ও সম্প্রীতি জোরদারে আনসার ভিডিপির সক্রিয় ভূমিকা রাখার বিষয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ বাহিনী কেবল নিরাপত্তা রক্ষা নয়, সামাজিক পরিবর্তনেরও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে।'
তিনি বলেন, ‘আনসার-ভিডিপি মানবসম্পদ উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে জাপানি ভাষা প্রশিক্ষণ, ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল মার্কেটিং, সিক্স জি ওয়েল্ডিংসহ বহুমাত্রিক চাহিদাভিত্তিক আধুনিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে যা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী। আমি মনে করি, এ ধরণের উদ্যোগ ও কর্মতৎপরতা দেশে বিদেশে আনসার ও ভিডিপির প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাকে আরও জোরদার করবে। '
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় আনসার-ভিডিপি বর্তমানে একটি নির্ভরযোগ্য ‘ফাস্ট রেসপোন্ডার’ স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী হিসেবে জনগণের আস্থা অর্জন করেছে। বন্যা, অগ্নিকাণ্ডসহ বিভিন্ন দুর্যোগে এই বাহিনীর সাহসিকতা, দ্রুততা ও মানবিক দায়বদ্ধতা দৃষ্টান্তমূলক। একইসঙ্গে রেইন ওয়াটার হারভেস্টিং, সোলার প্যানেল এবং বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনের মতো পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে এই বাহিনীর কর্মকর্তা ও সদস্যগণ টেকসই উন্নয়নের পথে দৃঢ়ভাবে অগ্রসর হচ্ছেন।'
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আনসার-ভিডিপির সাফল্যও প্রশংসনীয়। ৫ম,৬ষ্ঠ ও ৭ম বাংলাদেশ গেমসে পরপর তিনবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী ২০০৪ সালে ‘স্বাধীনতা পদক’ অর্জন করে। আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া আয়োজন সুষ্ঠু ও নির্বিঘ্নভাবে সম্পন্ন করতে বর্তমান সরকার দেশের ১০টি ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে ৩৭৯ জন অঙ্গীভূত আনসার সদস্য মোতায়েনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।'
ক্রীড়াকে একটি পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে বর্তমান সরকার যাবতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'খেলাধুলার বিভিন্ন ইভেন্টে যেসব খেলোয়াড় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে চলছেন, একটি বেতন কাঠামোর আওতায় এনে বর্তমান সরকার তাদেরকে স্পোর্টস কার্ড প্রদান করেছে। আপনারা নিঃসন্দেহে জেনেছেন, আনসার ভিডিপির ১৫ জন ক্রীড়াবিদকেও বর্তমান সরকার স্পোর্টস কার্ড প্রদান করেছে। '
মুক্তিযুদ্ধে বাহিনীর অবদানের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রায় ৪০ হাজার আনসার সদস্য রাইফেল নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এবং ৬৭০ জন সদস্য শহীদ হন। তাদের অবদান কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি এবং আল্লাহর দরবারে তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।'
প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য শেষে একাডেমিতে আনসার ও ভিডিপি বাহিনীর সদস্যদের তাঁত ও বুনন শিল্প, মৃৎ শিল্প, গবাদি পশু খামার, জাপানি ভাষা শিক্ষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ঘুরে ঘুরে পরিদর্শন করেন। সদস্যরা কিভাবে কাজ করছে সে সম্পর্কে তিনি অবহিত হন।
অনুষ্ঠানে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, রেল প্রতি মন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা এটিএম শামসুল ইসলাম, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামানসহ সংসদ সদস্য ও সরকারি ঊধর্বতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী সকাল ১০টায় বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৪৬ তম জাতীয় সমাবেশে যোগ দেন। তিনি শহীদদের স্মৃতি সৌধে পুস্পস্তবক অর্পণ করে কর্মসূচি শুরু করেন।
এর আগে সফিপুরে আনসার ভিডিপি একাডেমির প্যারেড গ্রাউন্ডে এসে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী এবং বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ।
আপনার মতামত লিখুন :