ইসলাম গ্রহণের প্রবণতা বাড়ছে ব্রাজিলে
নগরি২৪
নিউজ প্রকাশের তারিখ : Jun 20, 2026 ইং
ফুটবল, সাম্বা, আমাজনের বিস্তীর্ণ অরণ্য এবং মনোমুগ্ধকর সমুদ্রসৈকতের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত ব্রাজিল। দক্ষিণ আমেরিকার বৃহত্তম দেশটির পরিচিতি সাধারণত এসব বিষয় ঘিরেই সীমাবদ্ধ থাকে। তবে এই পরিচিত চিত্রের আড়ালে দেশটিতে নীরবে বিস্তার লাভ করছে ইসলাম, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গবেষক ও ধর্মীয় পর্যবেক্ষকদের বিশেষভাবে আকর্ষণ করছে।
খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ এই লাতিন আমেরিকান দেশে মুসলিম সম্প্রদায় এখন আর কেবল অভিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অভিবাসনের পাশাপাশি স্থানীয় ব্রাজিলীয়দের মধ্যেও ইসলাম গ্রহণের প্রবণতা বাড়ছে, যা দেশটির ধর্মীয় ও সামাজিক বাস্তবতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
ব্রাজিলের সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা আইবিজিই এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৭ লাখ ৬৭ হাজার থেকে ১৫ লাখের মধ্যে রয়েছে। যদিও বিভিন্ন গবেষণায় সংখ্যাগত কিছু পার্থক্য দেখা যায়, ইসলামিক সংগঠনগুলোর দাবি অনুযায়ী বর্তমানে ব্রাজিলে প্রায় ১৫ লাখ সক্রিয় মুসলিম বসবাস করছেন। এটি দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় শূন্য দশমিক সাত শতাংশ।
গবেষকদের মতে, সরকারি আদমশুমারিতে ধর্ম পরিবর্তনের তথ্য অনেক সময় দ্রুত হালনাগাদ না হওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
ব্রাজিলে মুসলিমদের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে বিভিন্ন মসজিদ ও ইসলামিক সেন্টার। ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী দেশজুড়ে প্রায় ১৫১টি সক্রিয় মসজিদ রয়েছে। এর পাশাপাশি শতাধিক নামাজকেন্দ্র এবং ইসলামিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে।
বিশেষ করে সাও পাওলো, পারানা, রিও ডি জেনেইরো, ব্রাসিলিয়া, কুরিতিবা এবং ফোজ দো ইগুয়াসু অঞ্চলে মুসলিম জনসংখ্যা এবং মসজিদের ঘনত্ব তুলনামূলক বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, ব্রাজিলে ইসলামের প্রসারের পেছনে দুটি বড় কারণ রয়েছে। প্রথমটি হলো অভিবাসন। গত শতাব্দীতে সিরিয়া, লেবানন ও ফিলিস্তিন থেকে বিপুল সংখ্যক আরব মুসলিম ব্রাজিলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও মুসলিম অভিবাসীরা সেখানে আসেন।
দ্বিতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে স্থানীয় ব্রাজিলীয়দের ইসলাম গ্রহণের প্রবণতাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন শিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক বিনিময়ের কারণে অনেক ব্রাজিলীয় ইসলাম সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হচ্ছেন। ফেডারেশন অব মুসলিম অ্যাসোসিয়েশনস ইন ব্রাজিলের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে দেশটিতে ইসলাম গ্রহণকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বর্তমানে ১০ হাজারের বেশি স্থানীয় ব্রাজিলীয় ইসলাম গ্রহণ করেছেন বলে সংগঠনটির দাবি।
ব্রাজিলের ইসলামি ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হলো সাও পাওলোর মেসকিতা ব্রাজিল। ১৯২৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মসজিদকে শুধু ব্রাজিল নয়, সমগ্র দক্ষিণ আমেরিকার প্রথম এবং সবচেয়ে পুরোনো মসজিদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে এটি দেশটিতে ইসলামি শিক্ষা ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
এ ছাড়া ফোজ দো ইগুয়াসু শহরের ওমর ইবনুল খাত্তাব মসজিদও মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম পরিচিত স্থাপনা। ১৯৮৩ সালে নির্মিত এই মসজিদটির স্থাপত্যশৈলী এবং বিশাল মিনার দেশি-বিদেশি পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
পারানা অঙ্গরাজ্যের রাজধানী কুরিতিবায় অবস্থিত ইমাম আলী ইবনে আবি তালিব মসজিদ এবং রাজধানী ব্রাসিলিয়ার ইসলামিক সেন্টারও মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ব্রাজিলের প্রায় সব মুসলিমই নগরাঞ্চলে বসবাস করেন। সাও পাওলো, রিও ডি জেনেইরো, ব্রাসিলিয়া, ফোজ দো ইগুয়াসু, কুরিতিবা এবং বেলো হরিজন্তে শহরগুলো মুসলিম জনসংখ্যার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
বিশ্বের অন্যতম বড় হালাল মাংস রপ্তানিকারক দেশ হিসেবেও ব্রাজিলের বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। দেশটির বিশাল হালাল খাদ্যশিল্প শুধু স্থানীয় মুসলিমদের প্রয়োজন মেটাচ্ছে না, বরং মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও বিপুল পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, ব্রাজিলে ইসলাম এখন আর শুধুমাত্র অভিবাসীদের ধর্ম হিসেবে বিবেচিত হয় না। স্থানীয় সমাজে মুসলিমদের অংশগ্রহণ, ধর্মীয় স্বাধীনতা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে ইসলামের প্রতি আগ্রহ দেশটিতে মুসলিম সম্প্রদায়ের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করছে।
ফুটবলপ্রেমী এই লাতিন আমেরিকান দেশে মুসলিমরা এখন একটি ছোট কিন্তু ক্রমবর্ধমান সম্প্রদায় হিসেবে নিজেদের অবস্থান গড়ে তুলেছেন। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী বছরগুলোতে ব্রাজিলে ইসলামের উপস্থিতি আরও দৃশ্যমান হবে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
আপনার মতামত লিখুন :