• ঢাকা
  • |
Alifhostbd

শুভ জন্মদিন ‘ফুটবল ভিঞ্চি’ লিওনেল মেসি


FavIcon
নগরি২৪
নিউজ প্রকাশের তারিখ : Jun 24, 2026 ইং
ছবির ক্যাপশন: Alifhostbd

রোজারিওর ধুলোবালি ওড়া রাস্তায় একটা ছোট্ট ছেলে পায়ে বল আঠারো মতো লাগিয়ে ছুটে চলেছে। প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডাররা তাকে ধরতে পারছে না, তার গায়ের জোর নেই, উচ্চতাও বাকিদের চেয়ে অনেক কম—কিন্তু তাঁর পায়ে যেন এক অদৃশ্য জাদুর কাঠি আছে। 

সেদিন আর্জেন্টিনার সেই ধুলোমাখা গলিতে যে রূপকথার জন্ম হয়েছিল, তা যে একদিন পুরো ফুটবল দুনিয়ার ব্যাকরণ বদলে দেবে, সেটা বোধহয় স্বয়ং ফুটবল দেবতাও আগে থেকে লিখে রেখেছিলেন। আজ সেই জাদুকরের জন্মদিন, যিনি আমাদের একটি আস্ত জীবন্ত মহাকাব্য উপহার দিয়েছেন।

গল্পের শুরুটা কিন্তু মোটেও রাজকীয় ছিল না। শরীরে বাসা বাঁধা গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি যখন এক বালকের আকাশছোঁয়া স্বপ্নকে পিষে ফেলতে চেয়েছিল, তখন বার্সেলোনার এক চিলতে কাগজ- একটি সাধারণ ন্যাপকিন পেপার হয়ে উঠেছিল ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে দামি দলিল। 

সেই ন্যাপকিন পেপারে সই করেই বার্সায় এসেছিলেন লিওনেল মেসি। ক্যাম্প ন্যু-র সবুজ ঘাসে লম্বা চুলের, ১৯ নম্বর জার্সি পরা ছেলেটা যখন রোনালদিনহোর পাস থেকে আলতো চিপে ক্যারিয়ারের প্রথম গোলটা করল, ধারাভাষ্যকারের কণ্ঠ চিরে বেরিয়ে এসেছিল এক বিস্ময়। সেই বিস্ময়ের শুরু, তারপর টানা দুই দশক ধরে তিনি প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে নাচিয়েছেন নিজের ইশারায়। যেন ফুটবলের লিওনার্দো দা ভিঞ্চি। 

পেপ গার্দিওলার অধীনে 'ফলস নাইন' হিসেবে ফুটবলকে দিয়েছেন নতুন ভাষা। একের পর এক ব্যালন ডি’অর আর ট্রফিতে যখন তার শোকেস ভরে উঠছিল, তখন মনে হচ্ছিল এই গ্রহের ফুটবল বুঝি তার পায়ের কাছে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে।

অথচ এই অতিমানবীয় গল্পের ওপিঠেই লুকিয়ে ছিল এক গভীর নীল বেদনা। 

বার্সেলোনার নীল-বেগুনী জার্সিতে যিনি সব্যসাচী, দেশের আকাশী-নীল জার্সিতে তিনিই যেন এক ট্রাজিক হিরো। ২০১৪ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে সেই সোনার ট্রফিটার পাশ দিয়ে তার শূন্য চোখে হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য কিংবা ব্যাক-টু-ব্যাক কোপা আমেরিকার ফাইনালে হেরে গিয়ে ২০১৬-র ডাগআউটে বসে শিশুর মতো কান্না—ফুটবল বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। নিজের দেশের মানুষই যখন তাকে পরবাসী বলে খোটা দিচ্ছিল, অভিমানী জাদুকর তখন অবসরের ঘোষণাও দিয়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু মহাকাব্যের নায়ক তো এভাবে হেরে যেতে পারেন না। ট্র্যাজেডি না থাকলে যে পুনরুত্থানের গল্পটা এত মধুর হতো না!

টানা ব্যর্থতার সেই মেঘ কেটে প্রথম সূর্যকিরণ দেখা দিল ২০২১ সালে, মারাকানার বুকে ব্রাজিলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকা জয়ের মাধ্যমে। কিন্তু নিয়তি তার জন্য সবচেয়ে বড় মঞ্চটা সাজিয়ে রেখেছিল ২০২২ সালের কাতারে। ৩৫ বছর বয়সী এক বুড়ো জাদুকর, যার কাঁধে ছিল কোটি মানুষের প্রত্যাশার পাহাড়।

সৌদি আরবের কাছে প্রথম ম্যাচ হেরে যখন দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেল, তখন থেকে শুরু হলো এক অবিশ্বাস্য ফিনিক্স পাখির মতো ঘুরে দাঁড়ানো। মেক্সিকোর বিপক্ষে সেই জাদুকরী দূরপাল্লার শট, নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে পাসের সেই অবিশ্বাস্য জ্যামিতি, আর ফাইনালে এমবাপের ফ্রান্সের সাথে সেই শ্বাসরুদ্ধকর স্নায়ুযুদ্ধ।

লুসাইল স্টেডিয়ামে যখন টাইব্রেকারে শেষ শটটি জালের ভেতর জড়াল, মেসি হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন মাঠের বুকে। সারা পৃথিবীর কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর চোখ তখন অশ্রুসিক্ত। কালো বিশত পরে যখন তিনি অবশেষে সেই অধরা সোনার ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরলেন, ফুটবল খেলাটা নিজেই যেন ধন্য হলো, পূর্ণতা পেল তার দীর্ঘদিনের ঋণ থেকে।

আজকের পড়ন্ত বিকেলে, ইন্টার মায়ামির জার্সিতে যখন মেসি মাঠে নামেন, তখন আর কোনো চাপ নেই, কাউকে কিছু প্রমাণ করার তাগিদ নেই। এখন তিনি খেলেন স্রেফ আনন্দের জন্য, আমাদের ফুটবল রোমান্টিসিজমকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। ৮টি ব্যালন ডি’অর, অসংখ্য রেকর্ড—এসব তো শুধুই কিছু শুষ্ক সংখ্যা। মেসির আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে তার পায়ে বল পাওয়ার পর স্টেডিয়াম জুড়ে তৈরি হওয়া সেই অবিশ্বাস্য স্তব্ধতায়, ধারাভাষ্যকারদের ভাষা হারিয়ে ফেলার জাদুকরী মুহূর্তে।

শুভ জন্মদিন, লিওনেল মেসি! আমাদের প্রজন্মে একটা আস্ত রূপকথাকে সত্যি করার জন্য এবং ফুটবলকে এতটা সুন্দর করে তোলার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

আলোচিত শীর্ষ ১০ সংবাদ