
বিরোধী দলের সংসদ থেকে ওয়াকআউটকে ‘পরিকল্পিত’ ও ‘বাহানা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বিরোধী দলকে সংসদীয় ধারা ও চর্চায় ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, তুচ্ছ কারণে কথায় কথায় সংসদ থেকে ওয়াকআউট করলে শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রেরই ক্ষতি হবে।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্য ও ওয়াকআউটের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এই সংসদকে কার্যকর করতে না পারলে গণতন্ত্র বারবার হোঁচট খাবে এবং এর জন্য ইতিহাস বিরোধী দলকেই দায়ী করবে।’
তিনি বলেন, সরকারের প্রধান লক্ষ্য আইন প্রণয়নসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ সংকটগুলোর সমাধান জাতীয় সংসদেই করা। রাজপথে বা গুলশানে অনেক কথা বলা সম্ভব হলেও সংসদের ভেতরে নির্দিষ্ট বিধি মেনে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে কথা বলতে হবে।
বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের সমালোচনা করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আইন প্রণয়ন কার্যক্রমে সহযোগিতা না করার উদ্দেশ্যেই পরিকল্পিতভাবে এই ওয়াকআউট করা হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রথম অধিবেশন থেকেই বিরোধী দল মানবাধিকার কমিশন আইন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়ে আসছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তাড়াহুড়ো করে তৈরি করা মানবাধিকার কমিশন আইনের ভুলত্রুটি সংশোধনে আইন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্টরা কাজ করেছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেশি-বিদেশি অংশীজন, কূটনৈতিক মিশন, মানবাধিকার সংস্থা এবং ইউএনডিপির সঙ্গে একাধিক সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন এবং দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিল প্রস্তুত করা হয়েছে।
সংসদে উত্থাপিত দুটি বিল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মানবাধিকার কমিশন বিল এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল—দুটিই সংসদে উত্থাপন করে কমিটিতে পাঠানোর কথা ছিল। বিলের কপি যথেষ্ট আগেই সংসদ সদস্যদের দেওয়া হয়েছে এবং সংসদীয় কমিটিতে আলোচনার জন্য আরও কয়েক দিন সময় পাওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু এসব বিল উত্থাপনকে বাহানা বানিয়ে বিরোধী দল সংসদ ত্যাগ করেছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।
রাষ্ট্রপতিকে চিঠি দিয়ে বিরোধীদলীয় নেতার সংসদ আহ্বানের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তোলার সমালোচনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিরোধীদলীয় নেতার এ ধরনের চিঠি দেওয়ার এখতিয়ার নেই। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির শপথসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ব্যস্ততার মধ্যেই তড়িঘড়ি করে সংসদ অধিবেশন আহ্বান করা হয়েছে। সরকারের এ উদ্যোগের প্রশংসা না করে অহেতুক সমালোচনা করা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সংসদ সদস্যদের ওপর কথিত হামলার অভিযোগ প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সুনির্দিষ্ট তথ্য দিলে সরকার অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে। কোনো সংসদ সদস্যের ওপর কোথায় হামলা হয়েছে বা কাকে গ্রেফতার করা হয়েছে—এ ধরনের নির্দিষ্ট তথ্য দিলে তাৎক্ষণিকভাবে জবাব দেওয়া সম্ভব।
গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত ও গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার কারণে সৃষ্ট সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকার কাজ করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল-গ্যাসের দাম বাড়লেও দেশে তা সহনীয় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি জানান, স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় জরুরি ভিত্তিতে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু, এফএসআরইউ নির্মাণ এবং এলএনজি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে সার কারখানা ও শিল্প উৎপাদন সচল রাখার পাশাপাশি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ‘জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫’-এর সমালোচনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ওই আদেশের কোনো রাজনৈতিক ভিত্তি বা রাজনৈতিক সমঝোতা ছিল না। জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের দাবি সরকারেরই ছিল, যাতে জনগণের প্রত্যক্ষ রায়ের মাধ্যমে এর আইনি ভিত্তি তৈরি হয়।
সংবিধান সংস্কারের নামে বিশেষ পরিষদ গঠনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান সংবিধানে এমন কোনো পরিষদের অস্তিত্ব বা বিধান নেই। সবাই এই সংবিধানের অধীনেই নির্বাচনে অংশ নিয়ে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনও এই সংবিধান অনুসারে অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও সংসদ বৈধ হলে বিশেষ কোনো পরিষদের কথা বলে সংবিধানকে অস্বীকার করা দ্বিমুখী নীতি।
সংবিধান সংশোধন নিয়ে সংসদে গঠিত বিশেষ কমিটি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কার্যপ্রণালি বিধির ২৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং সংবিধান সংশোধন করাই এর নির্ধারিত কার্যপরিধি। বিরোধী দলকে বিভ্রান্তি না ছড়িয়ে কমিটিতে এসে নিজেদের প্রস্তাব ও মতামত তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।
বক্তব্যের শেষে সরকারি ও বিরোধী দলের সব সংসদ সদস্যকে জাতীয় সংসদকে প্রাণবন্ত ও কার্যকর রাখার আহ্বান জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার আন্দোলন ও শহীদদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সংসদকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করার আহ্বানও জানান তিনি।