
ভারতীয় সঙ্গীত জগতের বড় খবর। সুরসম্রাজ্ঞী লতা মঙ্গেশকরের মৃত্যুর সেই শোকের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার গভীর উদ্বেগের ছায়া। সুরের আর এক কাণ্ডারি আশা ভোঁসলের অসুস্থতাকে কেন্দ্র করে। ৯২ বছর বয়সী কিংবদন্তি গায়িকা হৃদরোগ আক্রান্ত হয়ে মুম্বইয়ের বিখ্যাত ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (ICU) চিকিৎসাধীন।
তাঁর অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়তেই ভারত ছাড়িয়ে গোটা বিশ্বের সঙ্গীতানুরাগীদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
শনিবার সন্ধ্যাবেলা আচমকাই শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে প্রবীণ এই শিল্পীর। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, কয়েকদিন ধরেই সামান্য শরীর খারাপ ছিল তাঁর, কিন্তু শনিবার রাতে প্রবল শ্বাসকষ্ট এবং বুকে ব্যথা অনুভব করেন তিনি। কালক্ষেপ না করে তাঁকে তড়িঘড়ি ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানান যে, তিনি কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের (Cardiac Arrest) শিকার হয়েছেন। ৯২ বছর বয়স হওয়ায় তাঁর শারীরিক পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল, তাই তাঁকে সরাসরি আইসিইউ-তে স্থানান্তরিত করা হয়।
হাসপাতাল সূত্রে প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, প্রখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডক্টর প্রতীত সমদানীর তত্ত্বাবধানে আশা তাই-এর চিকিৎসা চলছে। উল্লেখ্য, এই চিকিৎসকই লতা মঙ্গেশকরের চিকিৎসার দায়িত্বে ছিলেন। বর্তমানে আশা ভোঁসলেকে অক্সিজেন সাপোর্টে রাখা হয়েছে।
হৃদযন্ত্রের সমস্যার পাশাপাশি তাঁর ফুসফুসেও সংক্রমণ ধরা পড়েছে, যার ফলে শ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছে। যদিও হাসপাতালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী তাঁর অবস্থা বর্তমানে 'স্থিতিশীল', তবে বয়সজনিত কারণে চিকিৎসকরা আগামী ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা তাঁকে কড়া পর্যবেক্ষণে রাখতে চান। পরিবারের পক্ষ থেকে বড় ছেলে আনন্দ ভোঁসলে সার্বক্ষণিক মায়ের পাশে রয়েছেন।
আশা ভোঁসলে কেবল একজন গায়িকা নন, তিনি ভারতীয় সংস্কৃতির এক জীবন্ত ইতিহাস। ১৯৩৩ সালে মহারাষ্ট্রের সাঙ্গলিতে সঙ্গীত পরিবারে তাঁর জন্ম। বাবা পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকরের কাছেই তাঁর হাতেখড়ি।
দিদি লতা মঙ্গেশকরের ছায়ায় থাকলেও নিজের অদম্য পরিশ্রম এবং স্বতন্ত্র গায়কি দিয়ে তিনি এক নতুন ঘরানা তৈরি করেছিলেন। দীর্ঘ সাত দশকেরও বেশি সময়ের কর্মজীবনে তিনি ১২,০০০-এর বেশি গান রেকর্ড করেছেন, যা গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে তাঁকে অনন্য উচ্চতায় বসিয়েছে। ২০টি-রও বেশি ভাষায় গান গেয়ে তিনি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়েছেন।
আশা ভোঁসলের কণ্ঠের বহুমুখিতা অতুলনীয়। একদিকে তিনি যেমন 'ইন আঁখো কি মস্তি কে'-র মতো গজল গেয়েছেন, তেমনই 'দম মারো দম' বা 'পিয়া তু অব তো আজা'-র মতো ওয়েস্টার্ন বিটের গানেও শ্রোতাদের নাচিয়ে তুলেছেন। রাহুল দেব বর্মণের (আর ডি বর্মণ) সঙ্গে তাঁর জুটি ভারতীয় চলচ্চিত্র সঙ্গীতের স্বর্ণযুগের সূচনা করেছিল। বাংলার সঙ্গেও তাঁর নাড়ির টান। 'আজ বিকেলের ডাকে' বা 'চোখে চোখে কথা বলো'-র মতো গান আজও বাঙালির নস্টালজিয়া।
ভারতীয় সঙ্গীতে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ ২০০১ সালে তিনি লাভ করেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মান 'দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার'। ২০০৮ সালে ভারত সরকার তাঁকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান 'পদ্মবিভূষণ'-এ ভূষিত করে। এছাড়াও দু’বার জাতীয় পুরস্কার এবং সাতবার ফিল্মফেয়ার শ্রেষ্ঠ মহিলা নেপথ্য গায়িকার পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। পরবর্তীকালে নতুনদের সুযোগ করে দিতে তিনি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার গ্রহণ করা বন্ধ করে দেন, যা তাঁর মহানুভবতার পরিচয় দেয়।
আশা ভোঁসলের অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়তেই বলিউড মহলে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে অমিতাভ বচ্চন, এ আর রহমান এবং নবীন প্রজন্মের গায়করা তাঁর দ্রুত আরোগ্য কামনা করেছেন। হাসপাতালের বাইরে ভক্তদের ভিড় বাড়ছে।
দেশের বিভিন্ন মন্দিরে তাঁর দীর্ঘায়ু কামনা করে যজ্ঞ ও বিশেষ প্রার্থনা শুরু হয়েছে। ভক্তরা ভালোবেসে যাঁকে 'আশা তাই' বলে ডাকেন, সেই প্রাণোচ্ছল মানুষটি যেন আবার সুস্থ হয়ে ফিরে আসেন, এটাই এখন কোটি কোটি মানুষের একমাত্র কামনা।
৯২ বছর বয়সেও আশা ভোঁসলে ছিলেন অত্যন্ত প্রাণবন্ত। বিভিন্ন রিয়ালিটি শো বা কনসার্টে তাঁর হাস্যজ্জ্বল মুখ এবং রসবোধ সবাইকে মুগ্ধ করত। আজ সেই সুরের জাদুঘরের সুস্থতার অপেক্ষায় দিন গুনছে গোটা দেশ।
চিকিৎসকরা আশাপ্রকাশ করেছেন যে, তাঁর অদম্য জীবনীশক্তি এবং দেশবাসীর প্রার্থনা বিফলে যাবে না। গোটা বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালের মেডিক্যাল বুলেটিনের দিকে—যেন আবারও ফিরে আসে সেই চেনা কণ্ঠস্বর, যা দশকের পর দশক ধরে আমাদের মনকে শান্ত করে এসেছে।