ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পের পর ৫ শতাধিক আফটারশক, নিহত ছাড়াল ১৭০০
নগরি২৪
নিউজ প্রকাশের তারিখ : Jun 30, 2026 ইং
পাঁচ দিন আগে আঘাত হানা শক্তিশালী দুই ভূমিকম্পের পর ভেনেজুয়েলায় এখন পর্যন্ত ৫০০টির বেশি আফটারশক অনুভূত হয়েছে। অন্যদিকে ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১ হাজার ৭০০। জাতিসংঘের আশঙ্কা, ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও অনেক মানুষ আটকে থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। একই সময়ে বহু দুর্গত এলাকায় সরকারি সহায়তা না পৌঁছানোয় স্থানীয় বাসিন্দারাই নিজেদের উদ্যোগে চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকাজ। আর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে লোকজনকে জীবিত উদ্ধারের আশাও ক্ষীণ হয়ে আসছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও এএফপির খবরে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। গত বুধবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় এক মিনিটেরও কম সময়ে ৭ দশমিক ২ এবং ৭ দশমিক ৫ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানে।
এদিকে সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, গত সপ্তাহের ভয়াবহ দুই দফা ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত ভেনেজুয়েলার বহু এলাকায় এখনও উল্লেখযোগ্য সরকারি সহায়তা পৌঁছেনি। ফলে স্থানীয় বাসিন্দারাই নিজেদের উদ্যোগে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে স্বজন ও প্রতিবেশীদের উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
গতকাল সোমবার ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির প্রেসিডেন্ট জর্জ রদ্রিগেজ জানান, ভূমিকম্পে মৃত বেড়ে এক হাজার ৭১৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এই ভূমিকম্পে পাঁচ হাজার ৩৪ জন আহত হয়েছেন। বহু মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। গৃহহীনের সংখ্যা ১৫ হাজার ৮৬৬।
ভেনেজুয়েলা কর্তৃপক্ষ ৩০টি দেশের কাছ থেকে সহায়তা পাওয়ার কথা জানিয়েছে। কতজন মানুষ এখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা, তা স্পষ্ট নয়। নিখোঁজদের সন্ধানে খোলা ওয়েবসাইটগুলোর তথ্যমতে, প্রায় ৪৫ হাজার মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
মার্কিন প্রশাসনের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভূমিকম্পে এ পর্যন্ত তিন মার্কিন নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে এবং ১২ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
স্টেট ডিপার্টমেন্টের একটি টাস্ক ফোর্স তিন শতাধিক মার্কিন নাগরিকের অনুসন্ধানের জবাব দিয়েছে। অন্য এক কর্মকর্তা জানান, তাদের হিসাব অনুযায়ী ভেনিজুয়েলায় প্রায় পাঁচ হাজার মার্কিন নাগরিক অবস্থান করছেন।
হতাহতদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিতাড়িত (ডিপোর্ট করা) প্রায় ১৪০ জনও আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের মধ্যে শিশুও ছিল। তারা এমন একটি হোটেলে অবস্থান করছিলেন, যা ভূমিকম্পে ধসে পড়েছে।
উদ্ধার অভিযানের পঞ্চম দিনে সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা যায়, প্রায় ২০০টি ভবন পুরোপুরি মাটির সঙ্গে মিশে গেছে এবং আরও কয়েকশ ভবন ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হতাহতদের সংখ্যা এত বেশি হওয়ার পেছনে সম্ভবত কয়েক দশকের অবহেলা, ভবন নির্মাণ বিধিমালা (বিল্ডিং কোড) প্রয়োগে শিথিলতা এবং সাবেক নেতা হুগো চাভেজ ও নিকোলাস মাদুরোর শাসনামলে লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রভাব রয়েছে।
কারাকাস থেকে প্রায় ৩৩ কিলোমিটার (২০ মাইল) পশ্চিমে অবস্থিত ছোট পাহাড়ি এলাকা এল জুনকিতোর বাসিন্দারা বলছেন, তারা সেখানে সরকারি কর্মকর্তাদের দেখা খুব কমই পেয়েছেন। বরং কৃষক এবং অন্যান্য স্থানীয় বাসিন্দারাই এখন একে অপরের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় রসদ বা ত্রাণের ব্যবস্থা করছেন।
কর্তৃপক্ষের কাছে নাগরিকদের পক্ষ থেকে অভিযোগ তুলে ধরা ৩৩ বছর বয়সী ম্যানিকিউরিস্ট কেইলি ইবারা বলেন, আমরা জবাব চাইছি; চাইছি ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করা হোক এবং ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলো দ্রুত পরিদর্শন করা হোক।
তিনি সরকারকে পরিস্থিতির প্রয়োজনে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
স্থানীয় একটি ক্যান্ডি দোকানের মালিক টনি আব্রেউ বলেন, আমরা জানি না, আমাদের কোথায় রাখা হবে বা কতদিন আমাদের এখানে থাকতে হবে। ভূমিকম্পের পর থেকে তিনি তাঁবুতে বসবাস করছেন, কারণ তার বাড়ি এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এখন আর নিরাপদ নয়।
ভূমিকম্পে এল জুনকিতোর বাণিজ্যিক এলাকাটি প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। সেখানে অনেক ভবন ধসে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। যাওয়ার মতো কোনো জায়গা না থাকায় অনেক মানুষ পাশের বিপজ্জনক ভবনগুলোর মধ্যেই খোলা মাঠে তাঁবুতে থাকছেন।
এদিকে স্থানীয় সময় সোমবার (২৯ জুন) ভোরে একটি আফটারশকে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে এতে নতুন কোনও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের ভাষায়, এটি ভেনেজুয়েলার ইতিহাসের ‘সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ’। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক সহায়তাও বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার জন্য ৩০ কোটি ডলারের বেশি সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, এই অর্থ জরুরি চিকিৎসা, খাদ্য সহায়তা, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন, আশ্রয়, সুরক্ষা এবং ত্রাণ পরিবহনে ব্যয় করা হবে।
মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস ফোর্ট লডারডেল বর্তমানে লা গুয়েরা উপকূলে অবস্থান করছে। জাহাজটির নাবিক ও মেরিন সদস্যরা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় এই এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছেন।
এছাড়া নেদারল্যান্ডস জরুরি ত্রাণসামগ্রী নিয়ে একটি জাহাজ পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে চীন প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ডলারের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন :