• ঢাকা
  • |
Alifhostbd

কষ্ট নিয়ে শূন্য হাত, চোখে জল এমবাপের


FavIcon
নগরি২৪
নিউজ প্রকাশের তারিখ : Jul 15, 2026 ইং
ছবির ক্যাপশন: Alifhostbd

তিনি কাঁদছেন। ডুকরে ডুকরে নয়, বরং এক অদ্ভুত নিভৃত যন্ত্রণায়। দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে, বুকের ভেজা জার্সিতে কান্না লুকিয়ে। তিনি হেঁটে যাচ্ছেন বোবা টানেল বেয়ে- ড্রেসিংরুমের সেই চেনা অন্ধকারের দিকে। যে ড্রেসিংরুম একটু আগেও ছিল রণহুঙ্কারে উত্তাল, তা এখন শোকাচ্ছন্ন। 

বুকে পাথরচাপা একরাশ কষ্ট নিয়ে আজ সেখানে গিয়েই মাথা নিচু করে বসবেন তিনি। ঠিক ৯০ মিনিট আগেও তো কোচ দিদিয়ের দেশমের বজ্রকণ্ঠ ড্রেসিংরুমের দেওয়ালে দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়েছিল—‘জয়, নয়তো জয়’।

অথচ ৯০ মিনিটের ব্যবধানে যেন জীবনের সব রঙ ফিকে হয়ে ধূসর হয়ে গেল। কিলিয়ান এমবাপে ভাবছেন, ভাবছেন আর ভেতরে ভেতরে ভেঙে চুরমার হচ্ছেন। এক বুক শূন্যতা আর তীব্র হৃদয়ক্ষরণের যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে হয়তো নিজেকেই নিজে শুধাচ্ছেন—এমনটা হওয়ার কথা তো ছিল না! 

ডান প্রান্ত থেকে উসমান দেম্বেলে কিংবা বাঁ প্রান্ত থেকে ব্র্যাডলি বার্কোলার নিখুঁত এক কার্লিং ক্রসের সূত্র ধরে স্পেনের জমাট রক্ষণ ভেঙে দেবেন। চোখের পলকে উনাই সিমনকে বোকা বানিয়ে বুনো উল্লাসে মেতে উঠবেন।

আহ, সেই উচ্চাশা- স্বপ্নগুলো কতটা নিদারুণভাবে ফিকে হয়ে গেল! আজ দুঃখের মেঘগুলো তাঁর পিছু ছাড়ছে না, যেন ভারী পাথর হয়ে চেপে বসেছে বুকের ওপর। যে দেম্বেলের সঙ্গে আগের রাতেও কত শত পরিকল্পনা করেছিলেন—গোলের পর উদযাপনের ভঙ্গিটা কেমন হবে! মাইকেল ওলিসে তো এককাঠি সরেশ। বাতাসে কাল্পনিক বাঁশি বাজানোর চেনা উদযাপন এবার আর চলবে না বলে আগেই জানিয়ে দিয়েছিলেন। 

তিনি চেয়েছিলেন সম্পূর্ণ নতুন এক ট্রেন্ডে মেতে উঠতে—আর্জেন্টিনার অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের সেই বিখ্যাত টিকটক ড্যান্স, কিংবা ফ্রান্সের ঐতিহ্যবাহী ফ্রেঞ্চ কানকান। সবার চেয়ে আলাদা, সবার চেয়ে অনন্য হওয়ার সেই শিশুতোষ আনন্দগুলো আজ ড্রেসিংরুমের মেঝেতে পড়ে থাকা ছেঁড়া কাগজের মতোই মূল্যহীন। 

সে সঙ্গে আট গোলের পর নবম গোল—কতবার যে নিজের হাতের কড়ায় গুনেছেন এমবাপে! আটের পর তো নয়, নয়ের পর যে দশ—এই সহজ হিসেবটা বড্ড কঠিন হয়ে বাজছিল বুকের ভেতর। সবুজ ঘাসের বুকে যতবারই চোখ বুলিয়েছেন, ভেবেছেন একটা জাদুকরি বল এলেই বুঝি গুঁড়িয়ে দেবেন প্রতিপক্ষের সাজানো দুর্গ। দূরপাল্লার কোনো শটের কথা মনে হতেই তাঁর ক্লান্ত স্বপ্নরা আবার নতুন করে ডানা মেলতো।

সবচেয়ে বড় অনির্বাণ ইচ্ছেটা ছিল লিওনেল মেসিকে ছাড়িয়ে যাওয়ার। যাঁর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করার মুহূর্তগুলো ছিল পরম আরাধনার, সেই মহামানবকে এক চিলতে ছাড়িয়ে যাওয়ার রোমাঞ্চই তো ছিল ভিন্ন। সোনালি ট্রফির এই মহাযজ্ঞে গোল্ডেন বুটের রেসে সেই চেনা জাদুকরের সঙ্গেই তো চলছিল তাঁর অলিখিত এক মহাকাব্যিক যুদ্ধ। একই সঙ্গে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বকালের সেরা গোলদাতা হওয়ার অদম্য বাসনা তো ছিলই।

২০টি গোলকে ২১-এ রূপ দিয়ে ইতিহাসের পাতায় নিজের নামটা অমর করে নেওয়ার সে কী তীব্র ব্যাকুলতা! কিন্তু নির্মম বাস্তবতায় আজ সবই বড় ম্লান। হলো না তাঁর, হলো না ফ্রান্সের সোনালি প্রজন্মের। বুধবার রাতের ডালাস স্টেডিয়ামের অতি উজ্জ্বল, ঝলমলে আলো তাই বিষাদের এক কালো চাদর হয়ে জড়িয়ে ধরেছিল একা দাঁড়িয়ে থাকা এক ট্র্যাজিক নায়ককে। 

যিনি হাত বাড়িয়ে পরম মমতায় ছুঁতে চেয়েছিলেন চ্যাম্পিয়নস লিগ, ছুঁতে চেয়েছিলেন লা লিগার রাজমুকুট, ছুঁতে ইউরো কিংবা ন্যাশন্স লিগ; কিন্তু অধরাই রয়ে গেল বিশ্বকাপের ২৩তম আসরের মতো সেই কাঙ্ক্ষিত ট্রফি গুলোও। গোটা একটা বছর ধরে নদীর জলের মতোই ঘাটে ঘাটে কেবল নিজের দুঃখের না বলা গল্পই যেন বয়ে নিয়ে চললেন তিনি।

অথচ ২০২৫-২৬ মৌসুমে লা লিগার সর্বোচ্চ গোলদাতা (২৫ গোল) ছিলেন এমবাপে, চ্যাম্পিয়নস লিগেও হ্যারি কেইনের চেয়ে এক গোল বেশি (১৫ গোল) করে মুকুট পরেছিলেন গোলদাতার। এত এত গোল, এত অর্জন—অথচ ক্লাব ফুটবলেও তাঁর দল পেল না কোনো সাফল্যের ছোঁয়া। আর বিশ্বকাপের এই মঞ্চে এসে যেখানে তাঁর স্বপ্নের সমাধি ঘটল, টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় কেবল তাঁর পাশেই জ্বলজ্বল করছিল মেসির নাম। 

নিয়তির কী নির্মম পরিহাস, এখানেও তাঁকে থমকে যেতে হলো এক বুক হাহাকার নিয়ে। মাঠের সব আলো যখন বিজয়ীদের মুখে আছড়ে পড়ছে, এমবাপে তখন ফিরছেন একদম শূন্য হাতে, বিষাদের এক অন্তহীন রাজত্ব বুকে চেপে।

আলোচিত শীর্ষ ১০ সংবাদ