প্যারাসোশ্যাল রিলেশনশিপ কী? এই সম্পর্ক কীভাবে তৈরি হয়
নগরি২৪
নিউজ প্রকাশের তারিখ : Mar 14, 2026 ইং
আধুনিক সময় সোশ্যাল মিডিয়া, ইউটিউব, বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, সিনেমা বা ওয়েব সিরিজ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বড় একটিং অংশ হয়ে উঠেছে। এসব যদি বিনোদনের মাধ্যম বা উপভোগ পর্যন্ত থাকে, তাহলে এপর্যায়ে থাকে। কিন্তু এসবের অতিরিক্ত উপভোগ্য কখনো কখনো তারকা, ইনফ্লুয়েন্সার বা কাল্পনিক চরিত্রদের নিজের কাছের মানুষ মনে করতে থাকেন কেউ কেউ। মনোবিজ্ঞানে এই একতরফা আবেগঘন সম্পর্ককে বলা হয় প্যারাসোশ্যাল রিলেশনশিপ।
প্যারাসোশ্যাল রিলেশনশিপ কী:
সাইকোলজি টুডের প্রতিবেদন অনুযায়ী প্যারাসোশ্যাল রিলেশনশিপ ব্যাপারে আরও সহজ করে বলতে গেলে, এটি এমন একতরফা সম্পর্ককে বোঝায়, যেখানে একজন ব্যক্তির মধ্যে এমন কারও সঙ্গে সংযোগ, ঘনিষ্ঠতা বা পরিচিতির তীব্র অনুভূতি তৈরি হয়, যাকে সে আদৌ চেনেই না। আর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এমনটা তারকা বা মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের প্রতি হয়ে থাকে। এ ধরনের সম্পর্কগুলো কেবল ওই ব্যক্তির মনেই থাকে, যারা পারস্পরিক সম্পর্কের অভাব থাকার পরও একটি বন্ধন অনুভব করেন।
১৯৫৬ সালে মনোবিজ্ঞানী ডোনাল্ড হর্টন এবং রিচার্ড উল ব্যবহার করেন শব্দটি। টেলিভিশন দর্শকরাও কখনো কখনো টিভি উপস্থাপক বা অভিনেতা কিংবা পর্দার চরিত্রগুলোর সঙ্গে আবেগগত সম্পর্ক তৈরি করতে শুরু করেন।
প্যারাসোশ্যাল রিলেশনশিপ শুধুই কাল্পনিক হলেও যে ব্যক্তি তা অনুভব করেন, তার কাছে সম্পর্কটি বাস্তব মনে হতে পারে। একজন ব্যক্তি যখন তার প্রিয় অভিনয়শিল্পী বা সংগীতশিল্পীর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের আবেগ দেখতে পারেন বা তাদের ওপর কোনো কিছু চিত্রাঙ্কন করতে থাকেন, যা তার অনুভূতি ও চ্যালেঞ্জগুলোকে প্রতিফলিত করে থাকে।
প্যারাসোশ্যাল রিলেশনশিপ কেন হয়:
এ ধরনের সম্পর্ক তৈরিতে প্রধান ভূমিকা রাখছে সোশ্যাল মিডিয়ায় কিংবা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। ইউটিউব ভিডিও, ইনস্টাগ্রাম লাইভ, ভ্লগ বা পডকাস্টে হাজির হওয়া কোনো সেলিব্রিটি যখন সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে কথা বলেন, তখন দর্শকের কাছে মনে হয় সেসব যেন তারা ব্যক্তিগতভাবে কথা বলছেন। ফলে দর্শকের সঙ্গে এক ধরনের ঘনিষ্ঠতার অনুভূতি সৃষ্টি হতে থাকে।
একজন ভক্ত, শুভাকাঙ্ক্ষী কিংবা নেটিজেন তার প্রিয় তারকার জীবনের যাবতীয় সব কিছু অনুসরণ করে থাকেন। এমনকি সেই তারকার সাফল্যে আনন্দ অনুভব কিংবা সমস্যায় দুঃখ অনুভবও করেন। কখনো কখনো এই আবেগ এতটাই গভীর হয়, তারা মনে করেন ওই তারকা যেন তার খুব কাছের মানুষ বা বন্ধু।
সমসাময়িক মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে এই একতরফা মানসিক টান এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে যেমন ইতিবাচক দিক রয়েছে, একইভাবে কিছু ক্ষতিকর প্রভাবও রয়েছে। মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসা কেন্দ্র গ্যাদার অ্যান্ড গ্রো ওসি এ ব্যাপারে এক প্রতিবেদনে ভালো ও খারাপ দিক তুলে ধরেছে।
ইতিবাচক প্রভাব:
প্যারাসোশ্যাল রিলেশনশিপের সীমাবদ্ধতা থাকলেও এটি অনেকের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যেরে উন্নতি ও অর্থপূর্ণ সংযোগের মাধ্যম হতে পারে। জীবনের কঠিন সময় এই একতরফা সম্পর্কগুলো মানসিক সাপোর্ট ও স্বস্তি প্রদান করে, যা একাকীত্ব দূর করতে কার্যকর। কোনো নির্দিষ্ট অভিনয়শিল্পী বা সংগীতশিল্পী কিংবা কাল্পনিক চরিত্রের ভক্ত হওয়া অনেক সময় ব্যক্তির মনে কোনো একটি গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অনুভূতি সৃষ্টি করে। যা ব্যক্তিটিকে এমন নিরাপদ পরিবেশের আবেশ জাগায়, যেখানে সে বিচারবুদ্ধির ভয় ছাড়াই নিজের আবেগ সহজেই প্রকাশ করতে পারে।
এছাড়া এ ধরনের সম্পর্ক ভক্ত বা শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়িয়ে সামাজিক মেলবন্ধন তৈরিতে সহায়তা করতে পারে। অনেক সময় পজিটিভ মিডিয়া ব্যক্তিরা অনুপ্রেরণার উৎস বা আইকন হিসেবে কাজ করে। যা ভক্ত-শুভাকাঙ্ক্ষীদের নিজস্ব স্বপ্ন ও লক্ষ্য পূরণে সহায়ক হয়।
নেতিবাচক দিক:
প্যারাসোশ্যাল রিলেশনশিপের একাধিক সুবিধা থাকার পরও এটি বিভিন্নভাবে মানসিক স্বাস্থ্যেরে ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কেননা, সাধারণত একতরফা সম্পর্কগুলো অনেক সময় মানুষেরে মধ্যে অবাস্তব বা অযৌক্তিক কিছু প্রত্যাশা তৈরি করে। এ ক্ষেত্রে বাস্তব জীবনের সম্পর্ক যখন ওই কাল্পনিক অবস্থানে বা ঘনিষ্ঠতার মানদণ্ডে পৌঁছাতে না পারে, তখন নিজের মধ্যে ব্যাপক হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এ ধরনের সম্পর্কের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত আবেগীয় নির্ভরশীলতা অন্যদের সঙ্গে পারস্পরিক ও মধুর সম্পর্ক গড়ে তোলার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে নিজের বাস্তবজীবনের সম্পর্কের ক্রমশ তুলনা কখনো কখনো আত্মমর্যাদাবোধ কমায়। এছাড়া এ ধরনের সম্পর্কে মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি ব্যক্তিকে আচ্ছন্ন বা ‘অবসেসিভ’ করে তুলতে পারে, যা মানসিকভাবে খুবই বিরক্তি ও ক্লান্তিকর।
বাস্তবতা ও কল্পনার মধ্যকার অস্পষ্ট সীমারেখার জন্য অনেক সময় আবেগীয় বিভ্রান্তিও তৈরি হয়। কারণ, এ ধরনের সম্পর্কে বিপরীত পক্ষ থেকে কোনো সাড়া বা প্রতিদান পাওয়ার সুযোগ থাকে না, এ জন্য ভক্ত-শুভাকাঙ্ক্ষীরা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অনুভূতিতে ভুগতে থাকেন। কাল্পনিক একতরফার এই সম্পর্কের ওপর নির্ভরতা মানসিক বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে এবং বিচ্ছিন্নতা বাড়ায়। একপর্যায়ে বিষণ্ণতা বা উদ্বেগের মতো সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে।
আপনার মতামত লিখুন :